গত ১৬ বছরে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ী ও তাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ ফিরিয়ে আনতে অন্তর্বর্তী সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় বাধার মুখে পড়েছে বাংলাদেশ।
অর্থপাচার মামলার প্রমাণ সংগ্রহ ও বিদেশে জমে থাকা অর্থ ফেরাতে সরকার একাধিক দেশের সঙ্গে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি বা মিউচুয়াল লিগাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রিটি করার প্রস্তাব দেয়। তবে প্রভাবশালী তিন রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ড সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা চুক্তির পরিবর্তে বিকল্প আইনি পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিকল্প প্রক্রিয়া অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও জটিল। এতে করে অর্থ ফেরানোর পুরো প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে গঠিত সরকারি ওয়ার্কিং কমিটির তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার অর্থপাচার মামলার প্রমাণ সংগ্রহে বাংলাদেশ ১৯টি দেশে মিউচুয়াল লিগাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট পাঠায়। প্রাথমিকভাবে ১০টি দেশকে চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হলেও কেবল সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও হংকং এতে সম্মতি জানিয়েছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড এখনো এ বিষয়ে কোনো অবস্থান জানায়নি।
পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে যুক্তরাজ্যকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়। এ কারণেই গত জুন মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুস লন্ডন সফর করেন। সফরে তার সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক না হলেও দেশটির নিরাপত্তা উপদেষ্টার কাছে সহায়তা চাওয়া হয়। এত উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক উদ্যোগের পরও যুক্তরাজ্যের সম্মতি না পাওয়াকে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
সরকারি শ্বেতপত্র অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। শুধু দুবাইতেই বাংলাদেশিদের মালিকানায় শত শত সম্পদের সন্ধান মিলেছে। যুক্তরাজ্যে সাবেক মন্ত্রী ও প্রভাবশালীদের নামে শতাধিক সম্পত্তির অভিযোগ রয়েছে, যার একটি অংশ ইতোমধ্যে ব্রিটিশ সংস্থা ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি জব্দ করেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের মতে, বড় রাষ্ট্রগুলোর আইনি চুক্তিতে অনীহা ইচ্ছাকৃত বিলম্ব কিংবা নিজস্ব স্বার্থের ইঙ্গিতও হতে পারে। তবে চুক্তি না হলেও বিকল্প পথে অর্থ ফেরানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো উপায় নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোই এখন অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হলে দেশের অর্থনীতি ও আর্থিক খাত পুনরুদ্ধারে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

