যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সশস্ত্র অভিযানে আটকের দাবি ওঠার পর আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। বাসচালক থেকে রাষ্ট্রনেতা হয়ে ওঠা এই রাজনীতিবিদ নিজের পুরো রাজনৈতিক জীবনেই যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদ ও হস্তক্ষেপের কট্টর বিরোধিতা করে এসেছেন।
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে জন্ম নেওয়া নিকোলাস মাদুরো একসময় ছিলেন সাধারণ বাসচালক। মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা এই নেতা ধীরে ধীরে শ্রমিক রাজনীতি ও বামপন্থি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৯০–এর দশকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তার রাজনৈতিক পরিচিতি গড়ে ওঠে।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নেতা হুগো চাভেজের হাত ধরেই মাদুরোর রাজনীতিতে উত্থান। ১৯৯৯ সালে তিনি গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদের সদস্য, জাতীয় পরিষদের স্পিকার এবং ২০০৬ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। চাভেজ তাকে তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করতেন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেন।
ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে হুগো চাভেজের মৃত্যুর পর তার ইচ্ছানুযায়ী অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান নিকোলাস মাদুরো। ২০১৩ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন তিনি। এরপর ২০১৯ ও ২০২৪ সালে পুনরায় নির্বাচনে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করে ক্ষমতা ধরে রাখেন, যদিও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্তত ৫০টি দেশ এসব নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেয়নি।
পূর্বসূরি চাভেজের মতোই নিকোলাস মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানে অটল থাকেন। ইরান, রাশিয়া, চীন ও তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি। এর ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে।
মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সময়ে বিরোধী দলকে সমর্থন, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং গোপন রাজনৈতিক ও সামরিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তবে এসব প্রচেষ্টা একাধিকবার ব্যর্থ হয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মদদে সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টাও সফল হয়নি।
২০২০ সালে মাদক পাচারের অভিযোগে নিকোলাস মাদুরোকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রথমে ১৫ মিলিয়ন ডলার এবং পরে তা বাড়িয়ে ৫০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে মার্কিন প্রশাসন। মাদুরো এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন।
গত কয়েক মাস ধরে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বেড়ে যায়। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে ভেনেজুয়েলার আশপাশে ব্যাপক নৌ ও বিমান মোতায়েন করে ট্রাম্প প্রশাসন। দীর্ঘ উত্তেজনার পর শুক্রবার মধ্যরাতে ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে মার্কিন অভিযানের দাবি ওঠে এবং সেই অভিযানে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে বলে ওয়াশিংটন দাবি করে।
তবে এই দাবির বিষয়ে ভেনেজুয়েলার পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চিতকরণ আসেনি। বিশ্লেষকদের মতে, নিকোলাস মাদুরোর জীবনের এই অধ্যায় লাতিন আমেরিকার রাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠতে পারে।

